আমফানের ল্যান্ডিং বন্দর শিল্পনগরী হলদিয়াতে,সবুজের ধ্বংসলীলা - SAIKOTBHUMI

Breaking

Tuesday, May 26, 2020

আমফানের ল্যান্ডিং বন্দর শিল্পনগরী হলদিয়াতে,সবুজের ধ্বংসলীলা




আবু রাইহান : স্যাটেলাইট ছবি দেখে নিশ্চিত হওয়া গেছে ভয়ঙ্কর আমফান  ঝড়ের ল্যান্ডফল তথা ল্যান্ডিং হয়েছে বন্দর শিল্পনগরী হলদিয়াতে! আবহাওয়া দপ্তরের হিসেব জানাচ্ছে ঝড়ের চূড়ান্ত গতিবেগ ২০৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল! ফলে সেই অর্থে দীর্ঘদিন ধরে বড় কোন ঝড়ের মুখোমুখি না হওয়া শিল্পশহর ঝড়ের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে গেছে! ঝড়ের রোশ সবচেয়ে বেশি পড়েছে গাছ বিদ্যুতের খুঁটির উপর! শুধু হলদিয়া টাউনশিপ এলাকাতে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ার সংখ্যাটা ১০ থেকে ১৫ হাজার! ছোট গাছগুলি বাতাসে উড়ে গিয়ে কোথায় পড়েছে তার কোন হিসেব নেই! আমার এক সাংবাদিক বন্ধু জানালেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বন আধিকারিক নাকি তাকে হিসেব দিয়েছেন, আমফান ঝড়ে জেলাতে নাকি এক লক্ষের মত গাছ নষ্ট হয়েছে

       এরকম বালখিল্য এর মত হিসেবে তিনি কোথা থেকে পেলেন আমি জানিনা! হলদিয়া পুরসভার চেয়ারম্যান– হিসেব অনুযায়ী কেবল পুর এলাকাতেই লক্ষের বেশি গাছ ধ্বংস হয়েছে! গ্রামীণ এলাকায় সুতাহাটা ব্লক, হলদিয়া ব্লক, নন্দীগ্রাম ব্লক এবং মহিষাদল ব্লক মিলিয়ে শুধু হলদিয়া মহকুমা ধরলে বৃক্ষ ধ্বংসের হিসাবটা কত লক্ষ গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা খুব মুশকিল! ঝড়ের তান্ডব এর দিন পরেও হলদিয়া পুর এলাকার অন্তত কুড়ি টি ওয়ার্ড এখনো ঝড়ের তাণ্ডবে উল্টে পড়া গাছ সরানো যায়নি !
                                                                 বিজ্ঞাপন


            মূল যোগাযোগের সড়কগুলোতে কোনরকম কিছুটা গাছ সরিয়ে মানুষজনের চলাচলের মত রাস্তা হয়েছে! গ্রামীণ ঢালাই পিচ রাস্তা গুলির উপর এখনো অসংখ্য গাছ উল্টে পড়ে রয়েছে! পৌরসভার উদ্যোগে সেই উল্টে পড়া গাছগুলি কেটে সরানোর কাজ চলছে! আমার নিজের দেশের বাড়ি নন্দীগ্রাম নম্বর ব্লকের সরবেড়িয়া গ্রামে! ঝড়ের তাণ্ডবে কপালগুণে আমার বাড়ি সেভাবে ক্ষতিগ্রস্থ না হলেও, আমাদের একটি গাছের বাগান বাড়ি ছিল! যেখানে দু'শোর বেশি ইউক্যালিপটাস, মেহগনি, আকাশমনি গাছ এবং ৩০–৪০ টির মতো নারকেল গাছ, শিরিষ গাছ, আম গাছ, বাঁশ গাছ ইত্যাদি ছিল! ঝড়ের তাণ্ডবে একটিও ইউক্যালিপটাস, মেহগনি এবং আকাশমনি গাছ দাঁড়িয়ে নেই! শিকড় থেকে উপরে সবকটি ভূপাতিত হয়েছে! বেশ কয়েকটি নারকেল গাছ উপড়ে পুকুরে পড়েছে! বাগানবাড়িতে গাছেদের করুন অবস্থা! নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকে বিদ্যুতের খুঁটি গুলির হাল দুমড়েমুচড়ে গিয়ে এমন হয়েছে, প্রায় বেশিরভাগ গ্রামেই নতুন করে বিদ্যুতায়নের খুঁটি বসাতে হবে! এই ২টি ব্লকের সমস্ত এলাকায় লক্ষ লক্ষ গাছ উপড়ে পড়ে আছে! কাঁটার মতো লোক পাওয়া যাচ্ছে না! আগামী এক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ আসবে কিনা আশঙ্কায় রয়েছে মানুষজন! সুতাহাটা গ্রামীণ এলাকাগুলিতে গাছেদের একি হাল!
বিজ্ঞাপন
         বিদ্যুতের হাল তছনছ হয়ে গেছে খুঁটি সহ ভেঙে পড়ায়! শুধু তাই নয় হলদিয়া এনার্জির হাইটেনশন লাইনের বেশ কয়েকটি বিরাট বিরাট টাওয়ার কে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে আমফান ঝড়! হলদিয়া শহরের কিছু কিছু এলাকায় ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সচল হলেও গ্রামীণ এলাকাগুলিতে বিদ্যুতের হাল খুবই করুন! মাঝখান থেকে খুঁটিগুলো ভেঙে পড়ায় খুঁটিগুলি নতুন করে না বসালে বিদ্যুৎ তাড়াতাড়ি আসার কোনো সম্ভাবনা নেই! টালির চাল বাড়িগুলির ভয়ানক দুরবস্থা! রাস্তার ধারের দোকানপাট, মার্কেট গুলির ছাউনি সবই উড়ে গিয়েছে! জল তুলতে মানুষজনকে জেনারেটর ভাড়া করতে হয়েছে তিন গুণ 4 গুণ দাম দিয়ে! হলদিয়া ডক কমপ্লেক্স, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল, মিৎসুবিসির মত কয়েকটি বড় বড় সংস্থা তাদের নিজেদের অল্টারনেটিভ পাওয়ার থাকার কারণে আমফানের তাণ্ডবে চূড়ান্ত বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মধ্যেও তাদের আলো জ্বলে ছিল! সেটা কে উদাহরণ হিসেবে ধরে জেলা রাজ্য প্রশাসনের তরফ থেকে কোথাও কোথাও বলা হয়েছে হলদিয়া নাকি ঝড়ের পর স্বাভাবিক হয়ে গেছে! প্রশাসনের এই পরিহাস হলদিয়া শিল্পশহর সহ হলদিয়া মহাকুমার মানুষকে ব্যথিত করেছে! প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রকৃতির সৃষ্টি, এর মধ্যে প্রশাসনের কোনো হাত নেই! তাই প্রশাসনকে কোন মানুষই দোষারোপ করছেন না! কিন্তু আমফান নামক ভয়ঙ্কর ঝড়ের যেখানে ল্যান্ডিং হল সেই বন্দর শিল্প নগরী হলদিয়া এবং হলদিয়া মহকুমা অদ্ভুতভাবে রাজ্য প্রশাসনের মুখ্য নজরদারির কেন্দ্রে পরিণত হলো না! হলদিয়া মহকুমা তথা পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ক্ষয়ক্ষতি এবং এখানকার মানুষের করুণ আর্তনাদ রাজ্য প্রশাসনের যেন হিসেবের বাইরে থেকে গেল! আর জেলা প্রশাসনই বা ক্ষয়ক্ষতির হিসেবে কেন কম করে দেখাচ্ছেন সেটাও আমাদের বোধগম্যের বাইরে
বিজ্ঞাপন

      বিদ্যুৎ দপ্তরের অধীনে ঠিকাদাররা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে যেভাবে গদাই লস্করি চালে কাজ করছেন তাতে আগামী এক মাসের মধ্যে বিদ্যুতের হাল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কিনা জেলার বেশিরভাগ মানুষই সন্দিহান হয়ে পড়েছেন! আর যেভাবে সবুজ ধ্বংস হয়েছে আগামী ১৫ থেকে কুড়ি বছরের মধ্যে এই ক্ষত মেরামত করা অসম্ভব ব্যাপার! আর মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে যে সমস্ত ঠিকাদার সংস্থা গাছকাটা দায়িত্বে রয়েছে তারা উপরে পড়া গাছ কাটার বদলে হেলে পড়া গাছগুলো কি আগে কেটে সাবাড় করে দিচ্ছেন! এসব দেখার মত প্রশাসনিক কোন নজরদারি নেই! শিক্ষায় এগিয়ে থাকা আমাদের জেলাকে যদি বাঁচাতে হয় প্রশাসনের সঙ্গে একযোগে সাধারণ মানুষকেও সবুজের অভিযানে নামতে হবে জীবনপণ করে! আমফান ঝড়ে বিপর্যস্ত মানুষকে কিছুটা ছাড় দিতে পুলিশ-প্রশাসন করোনা নিয়ে কড়াকড়ি শিথিল করেছিলেন! প্রশাসনিক নির্দেশে বেশিরভাগ দোকানপাট খুলে গিয়েছে! মানুষজন হঠাৎ করে ভুলে গিয়েছেন মাস্ক পরার কথা এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার নির্দেশ!ঝড়ের এই তাণ্ডবের পর প্রশাসনিক ডিলেডালা অবস্থার সুযোগে করোনা আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়ে চলেছে হুহু করে! সবমিলিয়ে চূড়ান্ত বিপন্নতা আমাদের গ্রাস করছে চারিদিক থেকে! দেশে লাফিয়ে লাফিয়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার পঞ্চম বারের জন্য লকডাউন এর সময়সীমা বাড়ানোর কথা রাজ্যের প্রশাসনকে নির্দেশ পাঠিয়েছেন! এখন সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকাটাই অস্তিত্বের সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে! আমাদের সবকিছু এখন অদৃষ্টের উপর ছেড়ে দিয়ে বসে থাকতে হবে এটাই হয়তো আগামী দিনের ভবিতব্য! অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়াতে আসার কথা শোনাচ্ছেন! একেই হয়তো বলে ধন্য আশা কুহকিনী!

বিজ্ঞাপন

                                 


Pages