গলদা চিংড়ি চাষে সমস্যা ও প্রতিকার : মৎস্য আধিকারিক সুমন সাহুর কলমে - SAIKOTBHUMI

Breaking

Thursday, August 8, 2019

গলদা চিংড়ি চাষে সমস্যা ও প্রতিকার : মৎস্য আধিকারিক সুমন সাহুর কলমে


গলদা চাষ নিয়ে প্রতিবেদন লিখছেন
সুমন কুমার সাহু, মৎস্যচাষ সম্প্রসারন আধিকারিক, হলদিয়া,পূর্বমেদিনীপুর। প্রতি সপ্তাহে মৎস্য চাষ নিয়ে থাকছে বিশেষ প্রতিবেদন।  

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন বিষয় জানা থাকলে চাষিরা লাভজনক গলদা চাষ করতে পারবেন । গলদা চিংড়ি চাষে সমস্যা ও প্রতিকার করা যাবে।

সঠিক নজরদারি চিংড়ি চাষে ভালো ফল দেয়।  যেহেতু চিংড়ি বিশেষ ভাবে পরিবেশ সচেতন তাই চিংড়ি চাষের পুকুরে প্রতি রাত্রে একটা ধীর গতি জল প্রবাহ বজায় রাখা দরকার নচেৎ শৈবালের আধিক্যে পুকুরের জল চিংড়ির প্রতিকূলে যেতে পারে। চিংড়ি চাষে সঠিক খাদয় প্রদান, জলের পি এইচ, তাপমাত্রা, দ্রবীভূত অক্সিজেন চিংড়ির প্রয়োজন অনুযায়ী রাখা একটা গুরুত্বপূর্ন বিবেচনার বিষয় । সেদিকে নজর রাখা খুবই জরুরী । প্রতি পনেরো দিন অন্তর জল পরিবর্তন করতে পারলে ভালো।

পুকুরের জলের পি এইচ ৭.৫-৮.৫ , দ্রবীভূত অক্সিজেন ৫-৮ মিলিগ্রাম/ লিটার , ক্ষারকীয়তা ৪০-১০০ মিলিগ্রাম/ জলে ( ক্যালসিয়াম কার্বনেট হিসেবে), ক্যালসিয়াম প্রতি লিটার জলে ১০ মিগ্রা এর কম, ফসফরাস  প্রতি লিটার জলে ১ মিগ্রা এর কম, নাইট্রেটস প্রতি লিটার জলে ১ মিগ্রা এর কম ও ম্যাগনেসিয়াম প্রতি লিটার জলে ২-৫ মিগ্রা থাকা জরুরি । 
     একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর গলদা চিংড়ির বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি পরীক্ষা করার জন্য নমুনা হিসেবে কয়েকটি চিংড়ি ধরে পর্যবেক্ষণ করা দরকার । ১৫ দিন পর পর ঝাঁকি জাল দিয়ে ৫-১০টি চিংড়ি ধরতে হবে।
 চিংড়িগুলোকে একত্র করে ওজন নিয়ে গড় ওজন বের করতে হবে এবং তা লিখে রাখতে হবে।
পরবর্তী ১৫ দিন পর ওজন নিয়ে আগের ওজনের পার্থক্য দেখে ওজন বৃদ্ধি পরীক্ষা করতে হবে।
নমুনায়িত চিংড়ি-গুলির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে। চিংড়ির এন্টেনা (দাঁড়ি গোঁফ), রোষ্ট্রেম (করাত), লেজ, ফুলকা এবং সাতার পাঁ অঞ্চল ভালোভাবে দেখতে হবে। এসব এলাকা কালো হয়ে যাচ্ছে কিনা বা দাঁড়ি গোঁফ পচন ধরছে কিনা ইত্যাদি দেখতে হবে।
এভাবে ১৫ দিন অন্তর অন্তর নমুনা পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

একটি স্বাভাবিক রোগমুক্ত চিংড়ি দেখতে কি রকম দেখায় ? চিংড়ির পদ গুলি দেখতে পরিস্কার এবং সম্পূর্ণ। শরীর পরিস্কার এবং চকচকে ও সম্পূর্ণ।   খোলস নরম নহে এবং সহজে ভেঙ্গে যাবে না। ফুলকা পরিস্কার এবং স্বাভাবিক রংয়ের। মাসে একবার জাল টেনে মাছ ও চিংড়ির স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করে তাৎক্ষণিবভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। পুকুরে ঘন ঘন জাল টানা ঠিক না। পুকুরে একবার জাল টানলে মাছ ও চিংড়ির যে ক্ষতি হয় তা পূরণ করতে এক দুই দিন সময় লাগে। 

চিংড়ি রোগ গ্রস্থ হলে কিভাবে বোঝা যাবে ? মাছ ও চিংড়ির সাধারণ চলাফেরা বন্ধ হয়ে যায়। মাছ ও চিংড়ি জনলের উপরে ভেসে খাবি খায়। এমনকি চিংড়ি জলের উপরে চলে আসার চেষ্টা করে।  ফুলকার স্বাভাবিক রং কালো হয়ে যায়।  দেহের উপর লাল/কালো/সাদা দাহ পড়ে। চিংড়ির খোলসের উপর সবুজ শেওলার স্তর পড়ে। চিংড়ির হাটার অঙ্গ এবং এন্টেনা (দাঁড়ি) খসে পড়ে অথবা আঁকা বাঁকা হয়ে যায়।  চিংড়ির খোলস নরম হয়ে যায় ইত্যাদি । এক এক করে আলোচনা করা যাক। 

চিংড়ির খোলস নরম হয়ে যায়, উপর থেকে চাপ দিলে নীচে ডেবে যায়। এই রকম অবস্তা জলের ক্যালসিয়াম কমে গেলে এ্যামোনিয়া ও তাপমাত্রা বেড়ে গেলে, পুষ্টিকর খাদ্য কমে হেলে এবং জলের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেলে এ রোগ হয়। মজুদ ঘনত্ব কমিয়ে পুকুরে অন্তত ৫০% জল বদল , পুকুরে প্রতি মাসে চুন প্রয়োগ ও পুকুরে সার ও খাদ্য প্রয়োগ নিয়ন্ত্রণ করলে এই রোগ প্রতিকার করা যায়। 
আবার কখনো চিংড়ির মাথায় ও ফুলকায় কালো দাগ দেখা যায়। এটিও একটি রোগের লক্ষণ । পুকুরে এ্যামুনিয়া ও লৌহ বেড়ে গেলে এবং খাদ্যে ভিটামিন কমে গেলে চিংড়ি এ রোগে আক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে চিংড়ির মজুদ ঘনত্ব হ্রাস, জল বদল (৩০-৫০%), প্রতি ডেসিম্যালে ২৫০ গ্রাম চুন প্রতিমাসে প্রয়োগ করলে এবং খাদ্যের সাথে ভিটামিন সি (০.০৩ মি.গ্রা./কেজি), ভিটামিন  (২৫ মিলি গ্রা./কেজি) মিশিয়ে দিলে এই রোগের প্রতিকার পাওয়া যায়  । 
চিংড়ি যখন আহরনযোগ্য আকার ধারণ করে তখন তাদের ফুলকার উপর ও নীচে কালো দাগ দেখা যায়। ফলে তাদের ফুলকা পঁচে যায় এবং শ্বাস প্রশ্বাস কষ্ট হয়। অবশেষে চিংড়ি মারা যায় এবং বাজারে চিংড়ির দাম কম হয়।পুকুরের তলদেশে অতিরিক্ত জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ কালো মাটি, মাটিতে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ও ফ্যাংগাস এর উপস্থিতির কারনে এই রোগ হয়ে থাকে । এক্ষেত্রেও পুকুরে জল পরিবর্তন (৩০-৫০%), সম্ভব হলে আশ্রয়স্থল তুলে দিয়ে হররা টেনে গ্যাস অপসারণ করে দিলে এবং পুকুরে চিংড়ির ঘনত্ব কমিয়ে দিয়ে খাদ্য নিয়ন্ত্রন করলে প্রতিকার পাওয়া যায়। চিংড়ির লেজের দিক থেকে মাংস সাদা ও শক্ত হয়ে যাওয়া একটি রোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। জৈব পদার্থ ও তাপমাত্রার আধিক্যের কারণে এ রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে। শুধু গলদা চিংড়িই এ রোগের কবলে পড়তে দেখা যায়। জল পরিবর্তনসহ গভীরতা বৃদ্ধি করে এ রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব। সুষম খাদ্য প্রয়োগ করেও এ রোগে ভালো ফল পাওয়া যায়। এ রোগের ক্ষেত্রে জলের গভীরতা ও পোনামজুদ হার সঠিক মাত্রায় রাখা অতীব জরুরি। পুকুরে অতিরিক্ত খাদ্য প্রয়োগের কারণে সবুজ শ্যাওলার আধিক্য হেতু চিংড়ির গায়ে শ্যাওলা পড়ে এই সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণত গলদার খামারে শ্যাওলা রোগের আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এতে চিংড়ির খোলস বদলাতে পারে না। দৈহিক বর্ধন প্রক্রিয়ায় ব্যাহত হওয়ায় চিংড়ি ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর কবলে পড়ে। এ ক্ষেত্রে পুকুর থেকে দূষিত জল বের করে দিয়ে নিয়মিত নতুন জল সরবরাহ করতে হবে। জলের গভীরতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি পোনা মজুদ হার হ্রাস এবং এ পর্যায়ে চুন সার ও খাদ্য প্রয়োগের পরিমাণ সীমিত রাখা অত্যাবশ্যক। শীতকালে গলদা খামারে এ রোগের পার্দুভাব বেশি দেখা যায়। এ সময় খামারে সার প্রয়োগ বন্ধ রাখা উত্তম।  খাদ্যে এমিনো এসিড, পটাশিয়াম, ভিটামিন সি এবং কোলেস্টেরল ঘাটতি থাকলে চিংড়ি অপুষ্টিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যেমনঃ পা, রোষ্ট্রাম বেঁকে যায় । চিংড়ি ধরে ঘনত্ব কমিয়ে
প্রোটিন মিনারেল সমৃদ্ধ খাদ্য প্রয়োগ করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

যাইহোক, গলদা চিংড়ি চাষে সাধারন সমস্যা প্রতিকারের মূল বিষয় হল , পুকুর নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় চুন প্রয়োগ। পুকুরের তলায় অতিরিক্ত কাদা অপসারণ। পুকুরে নিয়মিত সার প্রয়োগ প্রাকৃতিক খাদ্যের যোগান স্থিতিবস্থায় রাখা। প্রয়োজনের বেশী সার প্রয়োগ থেকে চাষীকে বিরত রাখুন।কোন অবস্থাতেই অতিরিক্ত পোনা মজুদ না করা।পুকুরের তলায় আশ্রয়স্থল সৃষ্টি করা।কোন অবস্থাতেই বেশী পরিমাণ খাদ্য প্রয়োগ না করা। পুকুরে কোন ক্ষতিকর দ্রব্য না ফেলা।চিংড়ির বয়স বাড়ার সাথে সাথে খাদ্যের পরিমাণ প্রয়োজন মত বাড়ানো। তাই প্রাকৃতিক খাদ্যের পাশাপাশি কিছু পরিমাণে সম্পুরক খাদ্য প্রয়োগ করা।পুকুর পাড়ে বড় ধরণের গাছ-পালা না রাখা এবং পুকুরে আলো বাতাস পড়ার সুযোগ থাকা।অল্প পরিমাণে জলজ গাছ থাকা। এবং চিংড়ির মিশ্র চাষ করাই ভালো ।  তাই চিংড়ির সাথে অল্প পরিমাণে কাতলা, সিলভার কার্প ও প্রাস কার্প ছাড়া।


Pages